ভারত থেকে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র, ভোটের আগে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
-
নিউজ প্রকাশের তারিখ :
Feb 9, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন:
নির্বাচনকে সামনে রেখে যশোরের বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক ঢুকছে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যশোরে এসব অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত দুই মাসে যশোর সীমান্তে বড় চারটি অস্ত্রের চালান আটক হয়েছে।সরকার পরিবর্তনের গত এক বছরে শুধু যশোর সীমান্ত এলাকাতেই ৬২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডে বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। ভোটাররা বলছেন, ভোটের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা না হলে তারা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে শঙ্কিত থাকবেন।
সরেজমিনে সীমান্ত এলাকা ঘুরে জানা গেছে, যশোরের শার্শা, চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলার প্রায় ২৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভারত সীমান্ত বিস্তৃত। নদী, ঘন বন, সমতল ভূমি এবং অনেক স্থানে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় চোরাকারবারিদের তৎপরতা বেশি। যশোর সীমান্তের ১১টি রুট দিয়ে অবৈধ অস্ত্রসহ বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য দেশে ঢুকছে। এর মধ্যে চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, শাহজাদপুর, হিজলা, পুটখালি, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা ও শিকারপুর উল্লেখযোগ্য।
সম্প্রতি আটক হওয়া অস্ত্র চালান এবং গ্রেফতার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জবানিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অস্ত্র আসে যশোর সীমান্ত দিয়ে। সাধারণত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশে তৈরি অস্ত্র বেশি আসছে। এর মধ্যে বিহারের মুঙ্গেরের ‘কাট্টা রাইফেল’, বেলঘরিয়ার ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’, খিদিরপুরের ‘ছক্কা পিস্তল’ এবং মুর্শিদাবাদের ‘ময়ূর পিস্তল’ রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক নাইন এমএম পিস্তল, সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম পিস্তল এবং পয়েন্ট ৩৮ ও পয়েন্ট ৩২ বোরের রিভলবারও ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব অস্ত্র আকারে ছোট হওয়ায় চোরাইপথে আনা সহজ এবং সহজে লুকিয়ে রাখা যায় বলে অপরাধীরা এগুলো বেশি ব্যবহার করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় অস্ত্র চালান আটক হয় গত ৩০ জানুয়ারি। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রাম ইউনিয়নের দড়িআগ্রা গ্রামের চুন্নু মোল্লার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১০টি গ্রেনেড, ৩টি বিদেশি পিস্তল, ১৯ রাউন্ড গুলি, ১টি চাপাতি, ১টি ছুরি ও ১টি খুর উদ্ধার করা হয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি পরিত্যক্ত অবস্থায় ৪টি ভারতীয় এয়ারগান, ১টি বিদেশি গ্যাস পিস্তল, ৩০টি ট্রিগার স্প্রিং, ১৪টি ব্যাকসাইড ইউ এবং ২৯টি ফ্রন্ট সাইড টিপ উদ্ধার করা হয়। একই রাতে যশোরে দুইটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পিস্তল, দুইটি ম্যাগাজিন, এক রাউন্ড তাজা গুলি, এক বক্স এয়ারগানের গুলি, দুইটি চাপাতি, একটি সাইড টেলিস্কোপ এবং পাঁচটি সিসি ক্যামেরাসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ।
এর আগে গত বছরের ৩০ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের মধুগ্রাম এলাকা থেকে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫০ রাউন্ড গুলি এবং ৪ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ লিটন গাজী নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ।
বেনাপোলের সাধারণ ভোটার রহমান বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ ছোট অস্ত্র আসে যশোর সীমান্ত দিয়ে। সীমান্তে খুব বেশি ধরা না পড়লেও যশোর শহর ও আশপাশে প্রায়ই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। তবে চোরাচালানে আসা অস্ত্রের তুলনায় আটক হওয়া অস্ত্রের পরিমাণ অনেক কম। যদিও বেশিরভাগ অস্ত্র যশোরে থাকে না, তবু যে পরিমাণ থেকে যায়, তা এলাকাকে অশান্ত করে তোলে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ অস্ত্রধারীরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে নিরাপদ থাকে, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেয় এবং গুপ্ত হত্যাকাণ্ড ঘটায়। অন্য চোরাচালান পণ্য ধরা পড়লেও অস্ত্র খুব একটা ধরা পড়ে না। ভোটের আগে যেভাবে অস্ত্রের তৎপরতা বাড়ছে, তাতে আমরা আতঙ্কিত। এই পরিস্থিতি থাকলে সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পাবে।
মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ভোটে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরির জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার জরুরি। কিন্তু যেভাবে অস্ত্র ঢুকছে, সেই তুলনায় খুব কমই ধরা পড়ছে।
তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্ত দিয়ে যাতে অস্ত্র ঢুকতে না পারে, সে জন্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অস্ত্র আটক করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, নির্বাচনকে নিরাপদ করতে দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্তে ৩৭ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো অস্ত্রের চালান ঢুকলেও তা দেশের ভেতরে প্রবেশের আগেই আটক করা হবে। অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষকে বিজিবির পাশে থাকতে হবে।
নিউজটি পোস্ট করেছেন :
জাতীয় দৈনিক প্রতিদিনের প্রহর
কমেন্ট বক্স